বাপ-দাদার ভিটেমাটি আর জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষিজমি ও লবণমাঠ হারানোর শংকা থেকেই মরণযুদ্ধ করছেন বলে জানিয়েছেন গণ্ডামারার মানুষ।
মঙ্গলবার দুপুরে (০৫ এপ্রিল) পশ্চিম গণ্ডামারার রহমানিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী বাংলানিউজকে এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান।
হাজারো মানুষের ভিড়ে মাঠের পশ্চিম প্রান্তে কথা হয় স্থানীয় কৃষক বাদশা মিয়ার সঙ্গে। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমার নিজের ভিটে ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই। বর্গা জমি নিয়ে চাষাবাদ করে কোনোরকমে জীবন কাটাই। এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে বর্গা জমিগুলো হাতছাড়া হয়ে যাবে। তখন বাঁচবো কীভাবে?
তিনি বলেন, সাগর উপকূলে শত প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করে টিকে আছি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরার পর এখন আমাদের মরণযুদ্ধ চলছে। ভিটেমাটি হারিয়ে, জীবিকার প্রধান অবলম্বন বর্গা জমি হারিয়ে মরবোই যখন লড়াই করে মরি।
৪৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ উল্লাহর চোখেমুখে একরাশ ক্ষোভ। চোখ লাল। হয়তো কাল রাতে ঘুম হয়নি। মুখটাও শুকিয়ে গেছে। তবুও স্লোগানে ঠিকই তাল দিচ্ছে ‘হবে না রে হবে না, কয়লা বিদ্যুৎ হবে না।’
কেন হবে না জানতে চাইলে বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার রক্ত দিয়েছি। জীবন দিয়েছি। এরপর কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে পারে না।’ বলে একটু থামলেন। গলা ধরে এসেছে তার। চোখে পানি। কিছুক্ষণ চুপ মেরে রইলেন। তারপর আবার বললেন, ‘লবণ মাঠে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাই। এখন লবণ মাঠই যদি না থাকে কাজ করবো কোথায়? তাই এ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছি। জীবন দিতে হলে দেবো তবুও লবণমাঠ রক্ষা করবো।’
গ্রামবাসীর ওপর পুলিশ-আনসার এবং সন্ত্রাসীদের হামলার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন শত শত নারীও। সমাবেশে সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী ঘোষণা দেন, সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হবে না এমন ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
এদিকে, বাঁশখালীর গণ্ডামারায় এস আলম গ্রুপের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে দুই গ্রুপের উত্তেজনাকে ঘিরে পুলিশ-আনসার ও গ্রামবাসীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় ৫৭ জনের নাম উল্লেখসহ তিন হাজার জনকে আসামি করে তিনটি মামলা করা হয়েছে।
এর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ ও সরকারি লোকজনের ওপর হামলার ঘটনায় বাঁশখালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বাহার মিয়া বাদী হয়ে একটি, নিহত দুই সহোদর ও জামাতার পরিবারের পক্ষে বশির আহমদ বাদী হয়ে একটি এবং নিহত জাকেরের পরিবারের পক্ষে স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন।
থানা সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলায় ৫৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত সহস্রাধিক আসামি করা হয়েছে। বশির আহমদের মামলায় বসতভিটা ও কবরস্থান রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক, বিএনপি নেতা লিয়াকত আলীসহ ছয় জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মনোয়ারার মামলায় অজ্ঞাত ১৫০০-১৮০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সোমবার (০৪ এপ্রিল) স্থানীয় হাজীপাড়া স্কুল মাঠে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে দুই গ্রুপের সমাবেশের মাইকিংকে ঘিরে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। এরপরও দু’পক্ষের লোকজন সমাবেশস্থলে এলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে ইটপাটকেল ছুড়লে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়ে। এ সময় গ্রামবাসী, আনসার ও পুলিশের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, তারা ১৪৪ ধারা জারির বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
একই পরিবারের নিহত তিনজন হলেন গণ্ডামারা ইউনিয়নের চরপাড়ার আশরাফ আলী বাড়ির মর্তুজা আলী (৩৫) ও মো. আনোয়ারুল ইসলাম (৪৪), তাদের বোনের স্বামী জাকের হোসেন (৩০)। রহমানিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা এলাকার বাসিন্দা জাকেরকে সোমবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরা তিনজনই লবণের মাঠে কাজ করতেন। মর্তুজার চার মেয়ে-দুই ছেলে, আনোয়ারের তিন মেয়ে-এক ছেলে এবং জাকেরের তিন ছেলে-পাঁচ মেয়ে রয়েছে।

Post a Comment