ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার: মেঘের ফাঁকে ভেসে থাকা একখন্ড কীর্তি
১৮৫০ সালে একবার কর্কোভাদো পাহাড়ের ওপর যিশু মূর্তি তৈরির প্রস্তাব এলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের শাসক, ধর্মীয় নেতারা কর্কোভাদোকে খ্রিস্টধর্মের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব করে আসছিলেন। পরে ১৯২১ সালে ব্রাজিলের ক্যাথলিকরা মূর্তিটি নির্মাণে এগিয়ে আসে। যা অবশেষে বাস্তবে রূপ লাভ করে ১৯২২ সালের ২২ এপ্রিল ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে। মূর্তিটি কেমন হবে সে সময় এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক ছিল। কেউ বলেছিলেন, যিশুর সঙ্গে ক্রুশকেও মূর্তিতে তুলে ধরা উচিত। কেউ বলেছিলেন তাঁর হাতে পৃথিবী থাকুক। তবে শেষ পর্যন্ত যেভাবে তৈরি হলো মূর্তিটি তা হলো, মানুষকে ভালোবাসার আলিঙ্গন দিতে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন যীশু।
এক প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে স্থানীয় প্রকৌশলী হেইটর ডা. সিলভা কস্টার প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে। লম্বা সময় ধরে তহবিল সংগ্রহের পর ১৯২৭ সালে এর আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৩১ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয়, আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত করা হয় ১২ অক্টোবর (১৯৩১)। ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারও ফরাসিদের তৈরি। যিশু মূর্তির ভাস্কর্যটি তৈরি করেন ফরাসি ভাস্কর পল ল্যান্ডৌস্কি। পলের নকশাকৃত ভাস্কর্যটি তৈরি করতে কোনো ইস্পাত ব্যবহার হয়নি বরং ব্যবহার করা হয়েছে রি ইনফোর্সড কংক্রিট। সোপ স্টোন বা সাবান পাথরে এর উপরিভাগ নির্মিত বলে ক্রাইস্টের শরীর অতি মসৃণ। সাবান পাথর এক ধরনের খনিজ পাথর। মূর্তিটি তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় ২৫ লাখ মার্কিন ডলার।
সাধারণ কোনো ক্যামেরা দিয়ে পুরো অংশের ছবি তোলা অসম্ভব:
ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার এতই বিশাল যে, সাধারণ কোনো ক্যামেরা দিয়ে এর ছবি তুলা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অনেকেই পাহাড়ের চূড়ার নানা প্রান্ত থেকে ছবি তোলার চেষ্টা করে কিন্তু কোনো না কোনো অংশ বাদ পড়ে যায়।
যেনো মেঘের বুকে ভেসে থাকা:
আটলান্টিক সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যিশুর মুখমণ্ডল পর্যটকদের কাছে ভেসে ওঠে মেঘের ফাঁক দিয়ে। তারপর একটু একটু করে সরে যাওয়া মেঘের ফাঁক দিয়ে একটা হাত, তারপর আরেকটা হাত, তারপর ভেসে ওঠে গোটা শরীর। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি।
সাবান পাথরে নির্মিত হওয়ায় ভাস্কর্যের গায়ে হাত ছোঁয়ালে সাবানে হাত ছোঁয়ানোর অনুভূত হয়। যদিও এ পাথরে শরীর ধোয়া যায় না কিন্তু ব্রাজিলীয়রা বিশ্বাস করে যে বৃষ্টির দিনে ক্রাইস্টের গায়ে সাবানের ফেনা দেখা যায় এবং তিনি নিজেই নিজেকে পরিষ্কার রাখেন।
ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারকে ঘিরে অনেক গল্প, কিংবদন্তি আছে। এগুলোর সবই ধর্ম বিশ্বাসভিত্তিক। গত ৮৩ বছরে ব্রাজিলে অনেক প্রলয়ঙ্করী ঝড় হয়েছে, সেইসব ঝড়ে অনেক ছোট ছোট স্থাপত্যও ভেঙে পড়েছে কিন্তু কিছুই হয়নি ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের, এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে প্রসারিত ওর হাত দুটোও কখনও ভেঙে পড়েনি। ক্রাইস্টকে বানাতে ব্যবহার করা হয়নি কোন ইস্পাত। তাহলে কেন এত ঝড়-তুফানে একটুও ম্লান হচ্ছে না এ মূর্তি? ব্রাজিলীয়দের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্য ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টানরাও বিশ্বাস করেন, তিনি তো ক্রাইস্ট, ঈশ্বরের পুত্র। ঈশ্বর কি তার পুত্রের ক্ষতি করবেন?
২০০৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বজ্রপাতে মূর্তিটির আঙুল, মাথা এবং ভ্রু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১০ সালের ১৫ এপ্রিল মূর্তিটির মাথায় এবং ডান হাতে রং ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটিকে জাতির বিরুদ্ধে করা অপরাধ আখ্যা দিয়ে জড়িতদের সম্পর্কে তথ্য প্রদানে ১০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
আশেপাশের পরিবেশ:
যিশু মূর্তির নিচে এক প্রার্থনা কক্ষ আছে। কাঠের ছোট ছোট বসার জায়গা। যে কেউ প্রার্থনায় অংশ নিতে পারে। কেউ প্রিয়জনকে কেউ। মা-বাবাকে কেউবা সৃষ্টি রহস্যকে ভেবে নিমিষে অন্যভুবনে পাড়ি জমায়। নীরবতা আর পবিত্রতা সেখানে হাতে হাত লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় যেন।
২০০৭ সালের ৭ জুলাই ‘ওপেন নেসের’ জন্যই মানুষের নির্মিত নতুন সপ্তাচর্যের তালিকায় স্থান করে নেয় ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার।
পর্যটকদের মিলনমেলা:
প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক এই স্থাপনাটি দেখতে ব্রাজিলে আসেন। ব্রাজিলে যে কোন পর্যটক ব্যবসায়ী ভ্রমণপিপাসু কবি সাহিত্যিক, পরিব্রাজক গেলেই কানে আসবে একটি শব্দ। ‘ক্রিস্তো’ মূলত স্ট্যাচু অভ ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারকে পর্তুগিজ ভাষায় বলে ‘ও ক্রিস্তো রেদেনভর’ সংক্ষেপে “ক্রিস্তো।” ছোট্ট নাম ‘ক্রিস্তো’। যেন তার ডাকনাম। এই নামেই সমধিক পরিচিত।
Post a Comment