জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৪ এর সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে মুরাদ পারভেজ পরিচালিত বিতর্কিত ‘বৃহন্নলা’ সিনেমাটি। বির্তকের বিষয়টি পুরনো হলেও আবারো আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে এ সিনেমা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৪ ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও বিভিন্ন মহলে সিনেমাটি নিয়ে ফের সমালোচনার ঝড় বইছে।
প্রয়াত লেখক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ‘রানী ঘাটের বৃত্তান্ত’ গল্প অবলম্বনে নির্মাতা মুরাদ পারভেজ প্রথম ‘চন্দ্র গ্রহণ’ সিনেমাটি নির্মাণ করেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘বৃহন্নলা’ সিনেমার গল্পও এ লেখকের ‘গাছটি বলেছিল’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন লেখকের কনিষ্ঠ পুত্র সাংবাদিক অমিতাভ সিরাজ। যদিও এই অভিযোগ উঠে গত বছর ভারতের জয়পুর চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বৃহন্নলা’ সিনেমাটি পুরস্কৃত হওয়ার পর। তখন এ নিয়ে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে।
এ বির্তক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখক পুত্র অভিজিৎ সিরাজ বলেছিলেন, ‘আমি এখনো সিনেমাটি দেখিনি। বাংলাদেশের একজন ব্যক্তি আমাকে বাবার ‘গাছটা বলেছিল’ এবং সিনেমাটির গল্পে মিল রয়েছে বলে জানায়। তারপরই আমি বিষয়টি জানতে পারি।’
অভিজিৎ অভিযোগ করে বলেন, ‘যখন আমার বাবা বেঁচে ছিলেন তখন মুরাদ আমার বাবার কাছ থেকে ‘চন্দ্রগ্রহণ’ সিনেমার গল্পের সত্ত্ব নিয়েছিলেন। আমি সঠিক বলতে পারব না, তবে সত্ত্ব বিক্রি করা হয়েছিল কয়েক লাখ টাকায়। বাবা ২০১২ সালে মারা যান। এজন্য হয়তো মুরাদ মনে করছেন এখন আর সত্ত্ব কেনার কোনো প্রয়োজন নেই এবং তিনি কোনো কৃতিত্ব না দিয়েই সিনেমাটি তৈরি করেছেন।’
বাংলাদেশে তার বাবার লেখার অনেক ভক্ত আছে জানিয়ে সিরাজের ছোট ছেলে অমিতাভ সিরাজ বলেছিলেন, ‘সেই ব্যক্তির মতে, সিনেমাটিতে তার বাবার গল্প খুব সতর্কভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। সিনেমার মূল বিষয়বস্তু সেখান থেকে নেওয়া। তবে সিনেমাটিকে ভিন্ন মাত্রা দেওয়ার জন্য কয়েকটি সাব প্লট ব্যবহার করা হয়েছে। সিনেমার কিছু চরিত্রের সঙ্গে বাবার গল্পের চরিত্রগুলোর মিল রয়েছে। আমি মনে করি, মুরাদ তার ক্রেডিট লাইনে বাবার গল্পের স্বীকৃতি প্রদান করবেন।’
এদিকে সিনেমায় ক্রেডিট দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নই আসে না বলে মনে করেন মুরাদ। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছিলেন ‘গাছটা বলেছিল’ গল্পটি পড়েননি।
এ প্রসঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে মুরাদ বলেছিলেন, ‘আমার সিনেমাটি নিজের লেখা একটি গল্প থেকে তৈরি এবং গল্পটির শিরোনাম ‘দ্য পয়জনিং সাপ’। বাবরি মসজিদের ঘটনা থেকে আমি গল্পটি লিখি। আমি ১৯৯৮ সালে সিরাজের ‘রাণী ঘাটের বৃত্তান্ত’ পড়েছি এবং ২০০৭ সালে এর সত্ত্ব কিনে নিয়েছি। জয়পুর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘বৃহন্নলা’ সেরা অভিনেত্রী এবং সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের পুরস্কারও জিতেছে।’
প্রয়াত লেখক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের সহোদর ভাই হাসমত জালাল। এ প্রসঙ্গে কলকাতা থেকে আজ দুপুরে মুঠোফোনে রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘গত বছরও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ জানতে পেলাম এ সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে। আমি এখনো সিনেমাটি দেখিনি। বাংলাদেশের বেশ কজন লেখকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যারা দাদার (সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ) লেখা সম্পর্কে গভীরভাবেই জানেন। তারা আমাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মুরাদ আমাদের বেশ পরিচিত একজন। সে এমন কাজ যদি করে থাকে তবে ঠিক করেনি। এটা গর্হিত কাজ। এটা জাতীয় লজ্জার বিষয়। আমরা আরেকটু সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে চাই। সত্যতা পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিব।’
গতকাল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণার পর এ বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় বইছে। লেখক, সংবাদিক স্বকৃত নোমান এ নিয়ে একটি স্ট্যাটাসও দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে স্বকৃত নোমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বৃহন্নলা সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে তা খুবই ভালো। কিন্তু এ সিনেমার গল্পকারের ন্যুনতম ক্রেডিটটুকুও তিনি দেননি। এই গল্পটি প্রয়াত লেখক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের গাছটি বলেছিল অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। নির্মাতা নাম তো দেন-ই নাই বরং গল্পটি নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। লেখককে একটা পয়সা সম্মানী না দিয়ে সিনেমা বানাবে, সুনাম কুড়াবে তা তো হতে পারে না। একজন শিল্পী তার শিল্পকর্ম সৃষ্টি করবেন অথচ তার স্বীকৃতিও পাবেন না?’
আপনি কিভাবে বুঝলেন গল্পটি মুস্তফা সিরাজের। এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘গল্পটি আমি পড়েছি। এই গল্পের উপর একটি বিশেষ সংখ্যাও আমাদের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তা ছাড়া লেখক পরিবার থেকেও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে।’
আজ শুক্রবার দুপুরে বৃহন্নলা সিনেমার নির্মাতা মুরাদ পারভেজের সঙ্গে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে পাওয়া যায়নি এ নির্মাতাকে।
সরকারি অনুদান নির্মিত এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ফেরদৌস, সোহানা সাবা, ইন্তেখাব দিনার, আজাদ আবুল কালাম, দিলারা জামান, ঝুনা চৌধুরী, আব্দুল্লাহ রানা, মানস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। গানের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন ইমন সাহা।

Post a Comment